মাতামুহুরী উপজেলার প্রথম ইউএনও ও এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পেলেন শাহীন দেলোয়ার, শুরু হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রম
কক্সবাজারের নবগঠিত “মাতামুহুরী” উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। নতুন এই উপজেলার প্রথম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মাঝে নতুন উদ্দীপনা ও আশার সঞ্চার হয়েছে।
শুক্রবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন শাহীন দেলোয়ার। একই সঙ্গে তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন উপজেলা গঠনের পর এটিই প্রথম বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ। ফলে স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি নিয়োগ নয়, বরং “মাতামুহুরী” উপজেলার বাস্তব যাত্রার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এখন বাস্তবে
দীর্ঘদিন ধরে চকরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের জনগণ পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে সরকারের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস উদ্যোগের অংশ হিসেবে চকরিয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় নতুন “মাতামুহুরী” উপজেলা।
সম্প্রতি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে নতুন উপজেলার অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর থেকে স্থানীয় জনগণের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বাজার, চায়ের দোকান ও রাজনৈতিক অঙ্গন—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু “মাতামুহুরী”।
এলাকাবাসীর মতে, নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার ফলে প্রশাসনিক সেবা আরও দ্রুত ও সহজলভ্য হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
শাহীন দেলোয়ারের ওপর বড় দায়িত্ব
চকরিয়ার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শাহীন দেলোয়ার ইতোমধ্যে প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনবান্ধব কর্মকাণ্ডের জন্য স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। নতুন উপজেলায় তাঁকে প্রথম ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নবগঠিত উপজেলা হওয়ায় শুরুতে প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করানো, সরকারি অফিস চালু করা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, জনবল সমন্বয় এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয় বিবেচনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতে, নতুন উপজেলার সফল বাস্তবায়নে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রশাসকের প্রয়োজন ছিল। শাহীন দেলোয়ার সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন বলে তারা আশাবাদী।
২৪টি সরকারি অফিসের অনুমোদন
গত ১৯ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপনে নতুন মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন সরকারি অফিসের সেট-আপ অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা ভূমি অফিস, থানা (পুলিশ স্টেশন), উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসসহ মোট ২৪টি সরকারি অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া এসব অফিস পরিচালনার জন্য মোট ৪০ জন কর্মকর্তা এবং ১৯৮ জন কর্মচারী নিয়োগের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও পাঠানো হয়েছে।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন উপজেলায় একসঙ্গে এতগুলো অফিস অনুমোদন দেওয়ার ফলে খুব দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়িয়ে যাবে। এতে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
কোথায় হবে মাতামুহুরী উপজেলার সদর দপ্তর
সরকারি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, মাতামুহুরী উপজেলার সদর দপ্তর স্থাপন করা হবে বেতুয়া মৌজার বটতলী বাজার এলাকায়।
স্থানীয়ভাবে বটতলী বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন ইউনিয়নের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় এলাকাটিকে সদর দপ্তরের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, উপজেলা সদর স্থাপনের ফলে বটতলী বাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে। নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা গড়ে উঠতে পারে।
প্রশাসনিক সেবায় আসবে গতি
নতুন উপজেলা গঠনের ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে প্রশাসনিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া। আগে ছোটখাটো কাজের জন্যও মানুষকে চকরিয়া উপজেলা সদরে যেতে হতো।
ভূমি সংক্রান্ত কাজ, জন্ম নিবন্ধন, বিভিন্ন সনদ, কৃষি সহায়তা, সমাজসেবা কিংবা সরকারি প্রকল্পের তথ্য পেতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হতো সাধারণ মানুষকে।
এখন মাতামুহুরী উপজেলা চালু হলে এসব সেবা স্থানীয় পর্যায়েই পাওয়া যাবে। এতে সময় ও অর্থ—দুইই সাশ্রয় হবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
বিশেষ করে নারী, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা
স্থানীয়দের মতে, উপজেলা গঠনের ফলে শুধু প্রশাসনিক সুবিধাই নয়, সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ত্বরান্বিত হবে।
উপজেলা সদরকে কেন্দ্র করে নতুন রাস্তা, হাসপাতাল, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসন ও ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে উঠবে। এতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ঢেমুশিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফ বলেন,
“আমরা এতদিন অবহেলিত ছিলাম। উপজেলা হলে এখন আমাদের এলাকাতেও উন্নয়ন হবে। রাস্তা, হাসপাতাল, অফিস—সবকিছুই আসবে।”
বদরখালীর এক ব্যবসায়ী জানান,
“উপজেলা সদর হলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। জমির মূল্যও বাড়তে পারে।”
স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও আশাবাদী। তাদের মতে, নতুন উপজেলায় সরকারি কলেজ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরি স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি প্রয়োজন।
মাতামুহুরী উপজেলা গঠনের ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অন্যান্য দুর্যোগের সময় দ্রুত প্রশাসনিক সাড়া দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
‘দৈনিক মাতামুহুরী’ নাম ঘিরেও বাড়ছে আগ্রহ
নতুন উপজেলার নাম ঘোষণার পর “দৈনিক মাতামুহুরী” নামটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোও এখন “মাতামুহুরী” কেন্দ্রিক সংবাদ ও ইতিহাস নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করেছে।
স্থানীয় তরুণদের মতে, “দৈনিক মাতামুহুরী” শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের নাম নয়; এটি এখন পুরো অঞ্চলের পরিচয় ও আবেগের অংশ হয়ে উঠছে।
মানুষের প্রত্যাশা এখন বাস্তবায়নের দিকে
স্থানীয়দের প্রত্যাশা—শুধু প্রশাসনিক ঘোষণা দিয়েই যেন কার্যক্রম থেমে না যায়। দ্রুত জনবল নিয়োগ, অফিস নির্মাণ, সড়ক উন্নয়ন এবং পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন “মাতামুহুরী” উপজেলা এখন কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতীক। আর সেই যাত্রার প্রথম প্রশাসনিক নেতৃত্বে শাহীন দেলোয়ারের যোগদান স্থানীয় জনগণের কাছে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের নতুন বার্তা হয়ে এসেছে।

