কক্সবাজার জেলার প্রশাসনিক ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং স্থানীয় জনগণের আন্দোলনের পর অবশেষে চকরিয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা “মাতামুহুরী” গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনিক পর্যায়ে নিরীক্ষা ও সমন্বয় কার্যক্রম শুরু হওয়ায় উপকূলীয় জনপদের মানুষের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
গত শনিবার বিকেলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এ সংক্রান্ত প্রথম প্রশাসনিক সমন্বয় ও নিরীক্ষা সভা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। সভায় সম্ভাব্য নতুন উপজেলার ভৌগোলিক সীমানা, প্রশাসনিক কাঠামো, নাগরিক সেবা বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত “মাতামুহুরী” উপজেলাটি গঠিত হবে চকরিয়ার সাহারবিল, ভেওলা মানিকচর, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া এবং বদরখালী ইউনিয়ন নিয়ে। প্রায় তিন লাখ মানুষের বসবাস এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক দূরত্ব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সেবা বঞ্চনার কারণে স্থানীয় জনগণ পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
নতুন উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক ও প্রাণপ্রবাহ “মাতামুহুরী নদী”-র নাম অনুসারে। প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী পার্বত্য অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে চকরিয়া ও মহেশখালী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয়দের মতে, “মাতামুহুরী” শুধু একটি নদীর নাম নয়, এটি পুরো অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের প্রতীক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন উপজেলা বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষকে আর ছোটখাটো প্রশাসনিক কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চকরিয়া উপজেলা সদরে যেতে হবে না। জন্ম নিবন্ধন, ভূমি সেবা, কৃষি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম সহজেই স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া যাবে।
বিশেষ করে দুর্গম ও উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য এটি হবে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। অনেক গ্রাম রয়েছে যেখান থেকে উপজেলা সদরে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। বর্ষাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ জনগণ দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক সুবিধা থেকে কার্যত বঞ্চিত ছিলেন। নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলে এই ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নতুন উপজেলা গঠনের পাশাপাশি চকরিয়া উপজেলার অধীনে আরও তিনটি নতুন ইউনিয়ন সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হারবাং ইউনিয়ন বিভক্ত করে “উত্তর হারবাং”, বরইতলী থেকে “পহরচাঁদা” এবং ডুলহাজারা থেকে পৃথক করে “মালুমঘাট” ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাবও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাকালে তিনি মাতামুহুরী উপজেলা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা বলছেন, মাতামুহুরী উপজেলা বাস্তবায়ন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি হবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন কাঠামোয় একটি বড় মাইলফলক। কারণ নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে চকরিয়ার প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ইতিহাসও জড়িত। ২০০১ সালে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে তিনি বৃহত্তর চকরিয়া থেকে পেকুয়াকে পৃথক করে নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় এবার মাতামুহুরী উপজেলাও বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত মাতামুহুরী উপজেলা শিগগিরই সরকারের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি বা নিকার (NICAR)-এর সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। সেখানে অনুমোদন পেলে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন উপজেলা ঘোষণার পথ আরও সুগম হবে।
এদিকে স্থানীয় জনগণের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন উপজেলা নিয়ে আলোচনা চলছে ব্যাপকভাবে। অনেকে এটিকে “দীর্ঘ ২৫ বছরের স্বপ্নপূরণ” হিসেবে উল্লেখ করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষক, কৃষক এবং তরুণ সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, মাতামুহুরী উপজেলা বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
বদরখালীর ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, “আমাদের ছোটখাটো কাজের জন্যও চকরিয়া যেতে হয়। নতুন উপজেলা হলে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়বে।”
ঢেমুশিয়ার এক কলেজ শিক্ষার্থী জানান, “শিক্ষা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে আমরা অনেক সময় পিছিয়ে থাকি। উপজেলা হলে নতুন নতুন অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
স্থানীয় কৃষকরাও আশাবাদী। কারণ কৃষি অফিস, মৎস্য অফিস এবং প্রাণিসম্পদ অফিসের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হলে কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপকূলীয় এই অঞ্চলে লবণ চাষ, মৎস্য আহরণ এবং কৃষি উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে এসব খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজার একটি দ্রুত বর্ধনশীল জেলা। পর্যটন, অর্থনীতি এবং জনসংখ্যার চাপ বাড়ার কারণে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই বাস্তবতায় মাতামুহুরী উপজেলা গঠনের উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে কক্সবাজারে নয়টি উপজেলা রয়েছে। মাতামুহুরী উপজেলা অনুমোদন পেলে এটি হবে জেলার দশম উপজেলা। এর ফলে প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণ সরকারি সেবার আওতায় আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু উপজেলা ঘোষণা করলেই হবে না; এর সঙ্গে প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন। উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, থানা, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত উন্নয়ন করতে হবে। তাহলেই মাতামুহুরী সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত হবে।
সব মিলিয়ে “মাতামুহুরী” এখন শুধু একটি প্রস্তাবিত উপজেলার নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে উপকূলীয় মানুষের বহু বছরের স্বপ্ন, আশা এবং উন্নয়নের প্রতীক। প্রশাসনিক এই উদ্যোগ সফল হলে কক্সবাজার জেলার দক্ষিণাঞ্চলে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

