চকরিয়া ভাগ হয়ে গঠিত হলো নতুন ‘মাতামুহুরী’ উপজেলা, কক্সবাজারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
কক্সবাজার জেলার প্রশাসনিক ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। দীর্ঘদিনের জনদাবি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অনুমোদন পেল নতুন “মাতামুহুরী” উপজেলা। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে চকরিয়া উপজেলাকে বিভক্ত করে এই নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২০তম বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনিক সেবা সহজতর করা, স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং জনসাধারণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে একাধিক নতুন উপজেলা ও সিটি করপোরেশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন “মাতামুহুরী” উপজেলা অনুমোদনের খবরে কক্সবাজারের চকরিয়া অঞ্চলে ব্যাপক আনন্দ ও উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা এটিকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ হিসেবে দেখছেন।
যেভাবে গঠিত হলো মাতামুহুরী উপজেলা
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চকরিয়া উপজেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন নিয়ে নতুন “মাতামুহুরী” উপজেলা গঠিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাহারবিল, ভেওলা মানিকচর, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া এবং বদরখালী ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করে এই নতুন প্রশাসনিক ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রায় তিন লাখ মানুষের বসবাস এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক দূরত্ব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে স্থানীয় জনগণ নানা ধরনের দুর্ভোগের শিকার হয়ে আসছিলেন। উপজেলা সদর চকরিয়ায় গিয়ে ছোট ছোট প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হতো সাধারণ মানুষকে।
বিশেষ করে বর্ষাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যেত। নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার ফলে এসব সমস্যার অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
কেন ‘মাতামুহুরী’ নামকরণ
নতুন উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক “মাতামুহুরী” নদীর নাম অনুসারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উৎপন্ন হয়ে কক্সবাজার অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই নদী স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, “মাতামুহুরী” নামটি এই অঞ্চলের মানুষের আবেগ, ইতিহাস এবং পরিচয়ের প্রতীক। তাই নতুন উপজেলার জন্য এই নামটি স্থানীয় জনগণের কাছেও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
প্রশাসনিক সেবা পৌঁছাবে মানুষের দোরগোড়ায়
নতুন উপজেলা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় সুফল হবে সরকারি সেবা সহজলভ্য হওয়া। স্থানীয় জনগণ এখন ভূমি অফিস, কৃষি অফিস, স্বাস্থ্যসেবা, সমাজসেবা, শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম নিজেদের কাছাকাছি এলাকাতেই পাবেন।
বর্তমানে অনেক মানুষকে জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি সংশোধন, ভূমি সংক্রান্ত কাজ কিংবা বিভিন্ন সরকারি সনদের জন্য চকরিয়া উপজেলা সদরে যেতে হয়। এতে দিনভর সময় নষ্টের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
মাতামুহুরী উপজেলা চালু হলে এসব সেবা দ্রুত ও সহজভাবে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে নারী, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাতামুহুরী উপজেলা বাস্তবায়নের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি এই অঞ্চলকে উপজেলা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অতীতেও চকরিয়ার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে তাঁর ভূমিকা ছিল। এর আগে বৃহত্তর চকরিয়া থেকে পেকুয়া উপজেলা গঠনের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
নিকার বৈঠকে আরও যেসব সিদ্ধান্ত
মাতামুহুরী উপজেলার পাশাপাশি একই বৈঠকে দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা বিভক্ত করে মোকামতলা, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভাগ করে রুহিয়া ও ভুল্লী এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা ভাগ করে চন্দ্রগঞ্জ নামে নতুন উপজেলা গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে দেশে উপজেলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯৫-এ।
স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়া
নতুন উপজেলা অনুমোদনের খবর প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেকেই এটিকে “ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
বদরখালীর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন,
“আমাদের ছোট ছোট কাজের জন্যও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হতো। এখন উপজেলা কাছাকাছি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়বে।”
ঢেমুশিয়ার এক কলেজছাত্রী বলেন,
“আমাদের এলাকায় উন্নয়ন কম ছিল। উপজেলা হলে নতুন রাস্তা, অফিস, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটা খুব ভালো খবর।”
একজন কৃষক জানান,
“কৃষি অফিস দূরে হওয়ায় আমরা অনেক সময় সঠিক সহায়তা পাই না। উপজেলা হলে কৃষি সেবা সহজ হবে।”
উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উপজেলা গঠনের মাধ্যমে কেবল প্রশাসনিক সুবিধাই বাড়বে না; একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হবে।
উপজেলা সদরকে কেন্দ্র করে নতুন বাজার, সড়ক, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। কারণ প্রশাসনিক কাঠামো সম্প্রসারণের ফলে দুর্যোগকালীন ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনা করা সহজ হবে।
কক্সবাজারের দশম উপজেলা হিসেবে নতুন পরিচয়
বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় মোট নয়টি উপজেলা রয়েছে। নতুন মাতামুহুরী উপজেলা অনুমোদনের মাধ্যমে জেলার উপজেলা সংখ্যা দাঁড়ালো দশটিতে।
পর্যটননির্ভর এই জেলার জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় নতুন উপজেলা গঠনকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই মাতামুহুরী উপজেলা ভবিষ্যতে দক্ষিণ কক্সবাজার অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মানুষের বহু বছরের স্বপ্ন এখন বাস্তব
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের মানুষ পৃথক উপজেলার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। রাজনৈতিক সভা, সামাজিক আন্দোলন এবং বিভিন্ন গণদাবির মধ্য দিয়ে “মাতামুহুরী” নামটি মানুষের মনে গভীরভাবে স্থান করে নেয়।
অবশেষে সরকারি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে। এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা—শুধু ঘোষণা নয়, দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কার্যকর প্রশাসনিক কার্যক্রমও নিশ্চিত করা হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন “মাতামুহুরী” উপজেলা শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন, স্বপ্ন এবং নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

